পিচ্চিবেলার অ্যাডভেঞ্চার ১

আমি কিন্তু অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করি। অনেক ছোট থেকে। ছোটবেলার অ্যাডভেঞ্চার বলি। ছোটবেলার স্মৃতি। যখন আমি অনেক ছোট এবং একটা হাসিখুসি বাবু ছিলাম তখন থেকে। একবার হল কি, আমি তখন স্কুলে পড়ি। হাফপ্যান্ট পড়া ক্লাস। চট্টগ্রাম নগরীর এক কোণায় একটা শান্ত উপশহর – অক্সিজেন। সেখানে থাকতাম। শহুরে দালান, টিনের বাড়ি, ধানক্ষেত, উন্মুক্ত প্রান্তর- মোটামুটি সবকিছু আছে (যা এখন অতীত)। উপশহের এক পাশে ক্যানটনমেন্ট। পাহাড় ঘেরা ক্যান্টনমেন্ট। পাহাড়গুলো নির্জন। জনমানবহীন। হঠাৎ ঝোক হল অ্যাডভেঞ্চার করার। দু’চার জন বন্ধুও জোগাড় হল। যতদূর মনে পড়ে রুনা লায়লা, বোরহান উদ্দিন, সোহেল, রাজু। তাদের বোঝালাম এটা কত সাংঘাতিক একটা অ্যাডভেঞ্চার। জনমানবহীন একটা জায়গা। আর আমরা তিন গোয়েন্দা।

এরপর সত্যিই এক বিকেলে আমরা বের হয়ে পড়লাম। ক্লাস থ্রি-তে পড়া বাচ্চা দু চারটা। গিয়েছি পাহাড়ে। অ্যাডভেঞ্চারে। বটতলী, ফতেয়াবাদ, একসময় চট্টগ্রাম ভার্সিটির রেললাইন পেরিয়ে সত্যিই পাহাড়ে উঠতে লাগলাম। এবং প্রথমবারের মত টের পেলাম- ভয় করছে। একজন বলল আর ভেতরে যাবার দরকার নেই। কিন্তু আমার তখন প্রবল উৎসাহ। ভেতরে একটা উত্তেজনা, আবার ভয়ও করছে। এই জঙ্গল শেয়ালের ব্যাক্তিগত প্রোপার্টি। প্রতি সন্ধ্যায় দলবল নিয়ে তারা হাক দেয়। দলীয় সংগীত পরিবেশন করে। এটা নিজের কানে শোনা। টেরিটরিয়াল প্রাণীগুলো সবসময় নিজের টেরিটরি পাহারা দেয়। যাই হোক। আমরা হেঁটে চলছি একটা আবছা ট্রেইল ধরে। চারদিকে নাম না জানা গাছ। গাছের পাতাগুলো কি অদ্ভুত এবং সুন্দর। কিংবা পাশের ছোট্ট সব জংলী ফুল গাছ। থোকায় থোকায় ফুল। একেকটা ফুল একেক রংয়ের। ভেতরে একটা বুনো গন্ধ। মাতাল করে দেয়। যত ভেতরে যাই, ততই চাপা উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সাথে বাড়তে থাকে ভয় পাওয়া বন্ধুদের বাড়ি ফেরার আর্তনাদ। ব্যাটা! এত তাড়াতারি ফিরলে তো আনন্দটাই মাটি!

পরে জেনেছি। ফুলটির নাম ল্যান্টানা। কি অসাধারণ তাই না?

আমরা হেঁটে চলেছি আবছা ট্রেইল ধরে। এক পাশে পাহাড়ের চুড়া, অন্য পাশে একটু দুরে বড় পাঁচিল। একটা কারখানা। ফৌজি ফ্লাওয়ার মিল। যাক। তবুও ভাল। বিপদে পড়লে চিৎকার দিলে, কেউ তো শুনবে। এই ভেবে সাহস দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সমানুপাতিক হারে হাটার গতিও বেড়ে গেল। হঠাৎ দেখি একটা মৃতদেহ। মানুষ নয়, বন্য শূকর। তবে দেহটি প্রায় ভাল অবস্থায় আছে। আর যায় কোথায়। কয়েকজন তো পারে তখনই দৌড় দেয়। আমি আর কয়েকজন চাপা উত্তেজনায় পরিস্থিতিটাকে হজম করলাম। কী সাংঘাতিক!

এভাবে একবুক সাহস জোগাড় করে হাটা দিলাম। আরো ভেতর। ওদিকে পা আর চলতে চায় না। এভাবে চলতে চলতে একসময় ট্রেইল শেষ হয়ে গেল। পথ নেই। আমরা কয়েকজন এ হাত ও হাত ধরাধরি করে উচু জায়গাগুলো টপকে উঠলাম। আরেকটু হেটেই সামনে দেখি এক বিশাল রাম দা। না জানি সবাই কেমন আঁতকে ওঠে। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, নাহ। কারো মধ্যে ভয় কাজ করছে না। হয়ত এতক্ষণে ওরা সবাই অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পেতে শুরু করেছে। আসলে এই জায়গাটিতে জঙ্গল কেটে লাকড়ি বিক্রির জন্য কেউ কেউ আসে হয়ত। এমন কেউই তার সিগনেচার রেখে গিয়েছে- এই রাম দা। যাহোক, আমরা সবাই এবার খুব উপভোগ করতে শুরু করলাম। প্রকৃতি এর পুরস্কার দিল তাই। সবাই এবার বলাবলি শুরু করল বাঘ, ভাল্লুক দেখা পাওয়ার বিষয়ে। অবশ্য এর কোনটাই পেলাম না। শান্ততা পুরস্কার হিসেবে একটা বুনো শুকর এলো। আমরা বেশ দুরে দাড়িয়ে ওকে দেখলাম। ও বেচারা আমাদের পাত্তা দিল না খুব একটা। নিজের মত পায়চারি করে এক সময় আড়াল হল। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় আমরাও ধীরে ধীরে বেড়িয়ে এলাম লোকালয়ে।

এর পর অবশ্য একাধিকবার অ্যাডভেঞ্জারে বেরিয়েছি। একই ভাবে। আমি, রাজু, বকুল, সোহেল, বৃষ্টি, মাহতাব, রুনা, নুসরাত, বোরহান, আকিব, আরো কত কে! আমরা কয়েকটা টু/ থ্রিতে পড়া বাচ্চা। আমাদের ইচড়ে পাকামোর কথা একসময় ক্লাসের অনেকেই জানতে পারে। জানাজানির পর দল ভারি হয়। এবং ‘দলীয় কোন্দল’ পাকিয়ে কয়েকটা টিম পর্যন্ত বানিয়ে ফেলে। সবশেষ যে নাদান ছেলেটা নেতা সেজে বেড়িয়ে পড়ে, সে ব্যাটা উজবুকের মত গন্ডগোল পাকিয়ে ফেরত আসে। ওর সাথে থাকা একটা কেউ স্যারের কাছে বিচার দেয় সেই নাদানের নামে। বেরিয়ে আসতে থাকে কেঁচো খুড়তে সাপ। একে একে আমার নাম সুদ্ধ সবার কথাই বেরিয়ে আসে। আর স্কুল থেকে এই সাংঘাতিক অন্যায়, এই নষ্টা অ্যাডভেঞ্চার করাকে চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ঘটনাটি ছিল দুঃসাহসীক। আমি নিজেও মাঝে মধ্যে অবাক হই। এত সাহস সেদিনগুলোতে পেয়েছিলাম কোথায়। সিনিয়র ক্লাসের ছেলেপুলেরাও অবার হয়ে তাকাত আমার দিকে।

ঘটনাটি ২০০০ সালের কোন এক মিষ্টি শান্ত বিকেলের কথা। ছোটবেলার স্মৃতি। আজ ২০২০। ঢাকার এক শান্ত উপশহর। বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসের রক্তঝরা মার্চ মাসে আমি বসে আছি ঘরের ভেতর। ঘাপটি মেরে। হেতু? কোয়ারেন্টাইন। ফর করোনা ভাইরাস। শুধু আমি না। পুরা ঢাকা শহরে এখন মৌনতা। ঢাকা শহরটাকে রোগে ধরা বৃদ্ধ এক মৃত্যুপথযাত্রিক মনে হচ্ছে। তবে আমার বিস্বাস, এ শহর আবার যেগে উঠবে। গোটা দেশ আবার জেগে উঠবে। কারণ বাঙ্গালী জাতির রক্তে আছে উঠে দাঁড়াবার বিস্বাস। হাজার বছরের শত প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার তথ্য আছে বাঙ্গালীর জেনেটিক তথ্যভান্ডারের প্রতিটি কোনায় কোনায়। শুভ কামনা!

বি. দ্র. – লেখাটা পড়ে নিজের কাছেই খুব নস্টালজিক লাগছিল। ছোটবেলার স্মৃতি। তাই কল্পনার খিচুড়িতে আরো একটা মশলা ঢেলে দিই। বুঝে নিন

error:
bn_BDBengali
en_USEnglish bn_BDBengali