কেমন আছ বন্ধু?

প্রিয় বন্ধু,

লেখাটা যখন পড়ছ, তোমার-আমার দূরত্ব তখন অনেকখানি। চাইলেই ক্লাস বাদ দিয়ে ক্যাফেতে বসে গল্প করা যাবে না! মেঘলা দিনে প্লাজা-তে দাঁড়িয়ে নিশ্চুপ হয়ে চেয়ে থাকা যাবে না পিছনের খালটার দিকে। তারচেয়ে লেখাটার হাত ধরে কিছু সময়ের জন্য অতীত দিনগুলোতে হারিয়ে যাই চলো।

ভার্সিটি অ্যাডমিশনের আমলে চাঁদ-তারা দেখতে দেখতেই এমআইএসটি’র প্রাঙ্গনে আসা। এমআইএসটি-তে আসার ব্যাপারটা আমার জন্য ছিল একটু অন্যরকম। বাইরে থেকে যে আকার আভিজাত্য দেখেছি, শুরুতেই একটু ঘাবড়ে গেলাম। প্রথম দিনের অভ্যর্থনার অনুষ্ঠান ঘিরে তাই ছিল টানটান উত্তেজনা। স্যুট, টাই কোনকিছুই বাদ গেল না কেনাকাটার লিস্ট থেকে। আমার মত বাউন্ডুলেও তাই ইউটিউব থেকে টাইয়ের নট বাঁধা শিখে নিল তড়িঘড়ি করে। পরদিন অনুষ্ঠানে এসে তো চোখ কপালে। হল জুড়ে এতো নতুন মুখ, কিন্তু টাইখানা পড়েছি শুধু এই আদমি, একা। নতুন ভর্তি হতে আসা অনেকেও মুখ টিপে হাসছিল। ব্যস্ততার মাঝখানে এই স্মৃতিগুলো এখনো আমাকে হাসায়।

ভার্সিটি জীবন শুরু হল। একই সাথে অসাধারণ এবং কঠোর পরিবেশ। এ যেন, “অর্ধেক ভার্সিটি তুমি, অর্ধেক কল্পনা।” আসল মজাটা শুরু হয় সিএসই-১০ নামের মজার একটা ব্যাচের যেদিন ক্লাস শুরু হল। ধীরে ধীরে দেখতে পাই অদ্ভুত সব কায়দা-কানুন, মজার সব মানুষ, মন মাতানো বন্ধুরা আর মন উড়িয়ে নেয়া কজন! এই তো সেদিনের কথা, সবাই মিলে ঘুরতে বেরিয়েছি বালুচরে, আর ক্লাস পালানো দল নিয়ে স্যার বেচারা রেগেমেগে অস্থির। সেদিন দলবেঁধে মজা করলেও আজকে তোমাকে অনেক মিস করি বন্ধু! কিংবা আমাদের গাছতলার কথাই ধর না। সারাদিন ক্লাসের পর যখন গাছতলার পাশে গিয়ে হৈ-হুল্লোড় হত! একবার তো পিছনের খালে পড়ে নেয়ে উঠলাম পুরোটা। সে কি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা!

অদ্ভুত মজার সময় ছিল ভার্সিটির ক্লাসরুমগুলো। বিরক্তি ছাড়া ক্লাসরুমগুলোকে সরস লাগত না মোটেও। কিন্তু বিশ্বাস কর, পড়াশোনার একেবারে শেষ দিকে এসে এটাই আমার সুন্দর দিনগুলোর ডায়েরি। একেকটা ক্লাসরুম যেন একেকটা চিন্তার রেভ্যুলেশন।

“একেকটা দিন যেন ডায়েরির খোলা পাতা

যেমন ইচ্ছে হয় – আমার লেখার খাতা ।”

ক্লাসের প্রথম দিককার কথা মনে আছে? ‘মেয়ে’ শব্দটার মধ্যে তখন রাজ্যের রহস্য। “পাহাড়ের রাজ্য থেকে নেমে এল একদল পরী, যারা কখনো পুরুষ দেখেনি!”- ছেলেমানুষি চিন্তাগুলো ছিল এমন মাত্রার অদ্ভুত। তারপর ধীরে ধীরে কল্পনার ঢেউগুলো তীরে এসে পড়ল। পেয়ে গেলাম অসম্ভব ভালো কিছু বন্ধু, বান্ধবীদের। অথচ কি ব্যাপারটাই না ছিল তখন! ছেলেমানুষিগুলো মনে আছে বন্ধু? ক্লাসের লুকোচুরি প্রেমগুলো কিন্তু চোখ এড়াতো না কারো। কিভাবে কিভাবে যেন দুই প্রান্তের দুটো পায়রা এসে জুড়ে যেত পাশাপাশি আর মনের আনন্দে উড়ে বেড়াত ক্লাসের পুরো সময়টা জুড়ে। আর আমরা প্রমাদ গুনতাম। হায়, কবে হবে …! জীবনটা এখন বড্ড বেশি গোছালো। ছোট্ট ছোট্ট এই অনিয়মগুলোকে বড্ড মিস করি এখন। তুমিও কি কর না বন্ধু?

মনে আছে অ্যাসেম্বলি ল্যাবের কথা? আমি কিন্তু এখনও ঐ ব্যপারটাকে ভয় পাই। কি বিব্রতকর ছিল ব্যাপারটা। ল্যাবের পুরো সময়টা বেকায়দায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করা হত না। তুমিও হয়ত আমার মত দাঁড়িয়ে থাকতে খানিকক্ষণ। এসির মাঝে থেকেও মাথা দিয়ে আগুন বেরুত মাঝে মধ্যে। তবে ব্যাপারটা কি জানো, সময়ের এ প্রান্তে এসে সেই কঠিন মুহূর্তগুলোকেও সোনালী মনে হয়। তোমাকেও অনেক মিস করি হয়তবা।

বন্ধু, তোমার মনে আছে- লিফটে উঠে পড়ে স্যারের কাছে বকুনি খাওয়ার কথা? কি ভয়ই না লাগত লিফটে সেই স্যারদের দেখলে! যে আইডি কার্ড না ঝোলানোর জন্য এতো বকুনি- এখন তাকিয়ে থাকা ছাড়া সেটা ঝোলানোর আর সুযোগ নেই। কার্ডটাকে এখনো মানিব্যাগে রেখেছি। আমার সেই বেকায়দায় তোলা ছবিটা একটু ঘোলাটে হয়েছে- এই যা। ফাইল খুলে একবার দেখে নিও, তোমার ছবিটা আগের মত আছে তো!

ওসমানী হলের ব্যাপারটা কিন্তু সবার চেয়ে আলাদা। হল বলতে ধারণা ছিল সবসময় লোকে লোকারণ্য এক জায়গা। আমাদের হলটা কিন্তু মোটেও তেমন না। এখানে দিন শুরু হয় অসম্ভব সুন্দর একটা সন্ধ্যা থেকে। বারান্দার পাশটায় দাঁড়িয়ে লাল সূর্যাস্তের আভা দেখার এমন সৌভাগ্য কজন মানুষের জোটে! আকাশের লাল আভা আর জমিনের সাদা, সৌম্য কাশফুল। ঝাঁকে ঝাঁকে কাশফুল। শেষদিকে আবাসনের হাত ধরে নাগরিক কোলাহল এসে সৌন্দর্যটাকে একটু ম্লান করলেও মনের একটা কোণায় এখনো ভেসে আছে সেই দৃশ্যটা। নিশ্চয়ই তুমিও দেখেছ সেই সুন্দরতমা সন্ধ্যাকে। আকাশের লাল আভা, কাশফুলের শুভ্র রেণু আর মন উড়িয়ে নেয়া প্রিয় মানুষ। কেমন লাগছে বন্ধু, পুরনো স্মৃতিগুলো উল্টে পাল্টে দেখতে? আমি জানি সুন্দর, অসম্ভব সুন্দর।

আচ্ছা তোমার মনে আছে কড়াকড়ি ডিসিপ্লিনের কথা? সে সময়ে কতটা অসহ্যই না ঠেকতো! একেবারে প্রথম ক্লাসেই ডিন স্যার এসেছিলেন। সেদিনের তার শিকার ধরা জালে আমিও আটকে গিয়েছিলাম। বাইরে নিয়ে ইংরেজীতে সেকি বকাঝকা। চুল, দাঁড়ি, গোঁফ- সবকিছুতেই ফিটফাট থাকার কড়া নির্দেশ। আমি ভাবলাম, অষ্টম আশ্চর্য বলে যদি কিছু থাকে, তাহলে সেটা আমাদের এমআইএসটি’র প্রাঙ্গণ। কি অবাক ব্যাপার, শেষ সময়টাতে এসে এসব ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না মোটেও। বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি জায়গাটাকে। তোমারও কি নস্টালজিক লাগে বন্ধু?

ছোট্ট ক্লাসরুমটাতে আমরা ছিলাম খুব অল্প কজনই। আমাদের আনন্দ, আমাদের সেলিব্রেশন- সবকিছু ছিল তাই চোখে পড়ার মত। মনে পড়ে সেই বন্ধুদের কথা? মনে পড়ে রাজিনের কথা- ক্লাসভর নিজের মত করে গান গেয়ে মজা করে বেড়ানো সেই বন্ধুটা। ত্রপা আর সামান্তা’র মানিকজোড়- কথা বলতে যেয়ে অ্যাটেনডেন্স দিতেও ভুলে যেত বেচারিরা। কিংবা সুমনের কথা; অদ্ভুত সব মজা করে ক্লাসে আর ক্লাসের বাইরে সবাইকে হাসাতো ছেলেটা। কিংবা সোহাগ বা হাসান- ‘সব কাজের কাজী’ ছেলেদুটো। সামিনার ছিল নানান রকমের মজার প্রশ্ন। মনে আছে মামুন ভাইয়ের কথা? মানুষটার অত্যাচারে পেতে খিল ধরে যেত হাসতে গিয়ে। কিংবা আশেক ভাইয়ের ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ক্লাস করার কথা? বিপাশার মত শান্তটি আর কজনই বা ছিল! ফার্স্ট ইয়ারে ‘সি’ প্রোগ্রামিং-এর ক্লাসে নাকানি-চুবানি খাওয়ার কথা। কিংবা ফ্যাকাল্টির সেই পরিচিত মুখগুলোর কথা। এ সবই এখন মনের স্টোররুমটাতে উঠিয়ে রাখা আছে। সময় পেলে দেখে নিও একবার। যত্ন করে রেখ বন্ধু।

লেভেল-৪ এর ক্লাসরুম। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। দুটো। একটা নিঃশব্দে, আরেকটা বিদঘুটে শব্দ করে। ক্লাসে বসে আছি। এইমাত্র ডিন স্যার ক্লাসে এসে ঢু মেরে গেলেন। গলাটা একটু শুকিয়ে এসেছে। দু’চারটাকে বাইরে নিয়ে বকা চলছে তুমুল। আজ সিট বাতিল হয় কয়জনের সেটাই ভাবছি। সামনে ডায়াসে দাঁড়িয়ে টীচার কি যেন পড়িয়ে যাচ্ছেন অনেক যত্ন করে। ফার্স্ট বেঞ্চের স্টুডেন্টরা মাথা নেড়ে বুঝে তা তুলে নিচ্ছে খাতায়। পিছনের স্টুডেন্টরা কেউ ঘুমে আবার কেউবা এই ম্যাগাজিনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।

আর আমি……… সেই চিরচেনা ব্যাকবেঞ্চটায় বসে লিখছি এই লেখাটা। তুমিও বসে আছ পাশের ওই কোনাটায়। কিন্তু লেখাটা যখন পড়ছ, তোমার আমার দূরত্ব হয়তবা ঢের বেশি।

কি অদ্ভুত, তাই না?

ভাল থেক বন্ধু!

শিশির

২৮/৭/১৩

পুনশ্চঃ লেখাটি একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশ করার জন্য করা হয়েছিল। নিজের নতুন ব্লগে সেঁটে দিলাম!

error:
bn_BDBengali
en_USEnglish bn_BDBengali